তৃতীয় অধ্যায় শক্তি বিভাজনের নয়টি স্তর - প্রথমাংশ

বিশ্বজয়ী বীর বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক 1861শব্দ 2026-03-18 18:33:45

প্রথম স্তরের সাধনার অর্থ হলো নিজের দেহকে এতটাই সুস্থ ও বলিষ্ঠ করা যে, তলোয়ার-বর্শা কিছুই শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। কথায় আছে, আটটি ঘোড়াকে সামনে ঠেলে দেওয়া, নয়টি ষাঁড়কে পিছনে টেনে আনা—ভাবতে সহজ মনে হলেও, আসলে তা করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ তো শস্য-শাকসবজি খেয়ে চলে, তাদের থাকে আবেগ-বাসনা, জন্ম-মৃত্যু, রোগ-শোক, সংসারের হাজারো দুঃখ-কষ্ট। এসব চিন্তা করলেই মনের মধ্যে অশান্তি আর ব্যাকুলতা জন্ম নেয়। সাধারণ মানুষের জন্য সাধনা ও দেহসাধন একেবারে দিবাস্বপ্নের মতো। সাধারণ মানুষের আয়ু বড়জোর আশি কিংবা একশো বছর; আর আমাদের সাধক সমাজে দেহসাধনার মাধ্যমে অনায়াসে কয়েক শত বছর বাঁচা যায়। আমাদের সাধনা শুধু ভালো খাবার খাওয়া নয়; আমাদের খেতে হয়, কিন্তু তা শুধু যেন তৃপ্তি মেটানো নয়, বরং অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণ। আমরা কী খাই? আমরা সাধারণ শস্যজাতীয় খাদ্য খাই না। আমরা গ্রহণ করি বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদে প্রস্তুত বিশেষ প্রাণশক্তিসম্পন্ন ওষুধ। এই ওষুধ খেলে প্রথমত আর কখনও ক্ষুধা লাগে না, দ্বিতীয়ত শরীরের সমস্ত অপদ্রব্য বেরিয়ে যায়, রক্ত ও স্নায়ুপথ শুদ্ধ হয়, ফলে আমাদের দেহ এক স্বচ্ছ, শক্তিশালী আধারে পরিণত হয় এবং পরবর্তী সাধনার জন্য মজবুত ভিত্তি গড়ে ওঠে।

শুধু ভালো খাবার খেলে চলবে না—প্রবল সাধনাও প্রয়োজন। দেহকে পাখির মতো হালকা, খরগোশের মতো চঞ্চল, উল্কার মতো দ্রুত করে তুলতে হবে। কিভাবে? কষ্টকে ভয় পেলে চলবে না, শ্রম-পরিশ্রমকে ভালোবাসতে হবে। কথায় আছে, “সবচেয়ে বেশি কষ্ট যে সহ্য করে, সে-ই হয় শ্রেষ্ঠ মানুষ।” কয়েক শত বছর বাঁচতে চাও, অথচ বিন্দুমাত্র কষ্ট না পেয়ে, তা কি সম্ভব? কখনোই না। যদি খুব সহজ হতো, তাহলে সবাই-ই তো সাধনা করত, কে-ই বা চায় না দীর্ঘজীবী হতে? আসলে এই কঠিন পথেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেবতাদের পার্থক্য গড়ে ওঠে। দেবতা হওয়া মানে এমন সব কষ্ট সহ্য করা যা অন্যের দ্বারা সম্ভব নয়, এমন সব সাধনা করা যা সাধারণের নাগালের বাইরে।

দ্বিতীয় স্তর হলো অলৌকিক শক্তি ও আত্মিক সংযোগ লাভ। এ কী? মনোযোগ দিয়ে শোনো—যখন দেহসাধনা চূড়ান্তে পৌঁছে যায়, তখন তোমার শরীর ও চেতনায় এমন এক নতুন জগৎ উদ্ভাসিত হয়, যা আগে কল্পনাতীত ছিল। তখন মনে হবে, তোমার শরীরে অফুরন্ত শক্তি, পাহাড়-পর্বত স্থানান্তর করার বলও যেন আছে। যদিও প্রকৃতভাবে পাহাড়-পর্বত স্থানান্তর তখনও অনেক দূরের বিষয়, তবে সাধারণ মানুষের তুলনায় তখন তোমার শরীরে হাজারটা ষাঁড়ের সমান শক্তি। তখনই একে বলা হয় “অলৌকিক শক্তি”। এই শক্তি অর্জনের সাথে সাথে শরীরের সমস্ত স্নায়ুপথ সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হয়, তখন তুমি এমন অনেক কিছু দেখতে পারো যা আগে অগোচর ছিল—যেমন আত্মা, বাতাসের রং। চোখ বন্ধ করলেও নিজের দেহের শিরা-উপশিরা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখতে পারবে। এটা দেহসাধনার অতীত আরও এক নতুন স্তর।

সাধনায় আরও উন্নতি হলে, তুমি প্রবেশ করবে তৃতীয় স্তর—স্বর্ণবিন্দু পর্যায়ে। এ পর্যায়ে তোমার শরীরের শক্তি যত বাড়ে, স্নায়ুপথ ও প্রাণশক্তি সঞ্চয় করার জায়গা যখন আর ধারণ করতে পারে না, তখন দেহের গভীরে ধীরে ধীরে স্বর্ণাভ একটি কণা গড়ে ওঠে। সাধনার অগ্রগতির সাথে সে কণাটি বড় হতে থাকে। কারো ক্ষেত্রে ডিমের মতো, কারো মাথার সমান, আবার কারো ক্ষেত্রে বাস্তবিকই মানবাকৃতির সমান হয়, যা সহস্র বছরে একবার ঘটে, তখন সে ব্যক্তি অতুলনীয় শক্তিধর হয়ে ওঠে। তোমার দুই সহোদর শিষ্য যেমন এই বিরল ভাগ্যপ্রাপ্ত।

তুমি, শিষ্য, হয়তো জানতে চাইলে, আমি কিভাবে জানি তুমি বিখ্যাত যোদ্ধা যশোবরের পূনর্জন্ম? বাহ্যিকভাবে আমি বৃদ্ধ-দুর্বল, কিন্তু মনে রেখো, আমি অন্তত পঞ্চাশবার জন্ম-মৃত্যুর চক্র অতিক্রম করেছি। প্রতিটি চক্র মানে এক মহাবিনাশ, আর প্রতিটি চক্রে অন্তর্ভুক্ত আছে এক লক্ষ যুগ, আর প্রতিটি যুগে দশ হাজার বছর।

—তাহলে গুরুদেব, আপনি তো প্রকৃতই আদিকালের প্রাচীনতম প্রাণী!

হ্যাঁ, এমনটাই বলা যায়। তবে তোমার মতো শিশুসুলভ কথা আমার সামনে আর কখনো বলো না। ভবিষ্যত কেমন হবে, জানি না, তবে কোটি কোটি বছরের অতীত আমার সামনে স্পষ্ট। স্বর্ণবিন্দু যত বড় হবে, ততই তুমিও শক্তিশালী হবে। তখন তোমার আয়ু হবে লক্ষ বছর, পাহাড়-পর্বত স্থানান্তর করা তখন আর কল্পনা নয়। স্বর্ণবিন্দুর শেষ পর্যায়ে এলে এ মহাদেশে আর কেউ তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। আজকের দিনে সবাই বিজ্ঞানকে মানে, অলৌকিক শক্তির কথা হাস্যকর মনে করে, দেবতা-অস্তিত্ব কেবল গল্প-কাহিনি বলে উড়িয়ে দেয়। তাদের দোষ দেয়া চলে না—তারা তো সাধারণ মানুষ, বিজ্ঞানীর তৈরি অস্ত্র দেখেই ভাবে পৃথিবীর সবকিছু অর্জন করা সম্ভব। তারা ভীষণ ভুল করছে। আমি চাইলে একটি নিঃশ্বাসে গোটা ছায়াপথকে ধ্বংস করতে পারি, কিন্তু করি না—কারণ, মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা করাই নিয়ম। এদের নিজেদের ভাগ্যে যেটা আছে, সেটাই হবে।

তবু, কিছু মানুষ এখনও আমাদের অস্তিত্ব মেনে চলে—তারা দেশের শাসক, যারা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের একত্রিত করে বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, এই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্নরাই পূর্বজন্মের সাধকদের পুনর্জন্ম। রাষ্ট্রীয় কাজেই তারা নিয়োজিত, নানা সংকট মোকাবিলায় তাদের ব্যবহার হয়। আমাদের সাধকদের শক্তি সাধারণ মানুষদের তুলনায় ভাষায় প্রকাশের অতীত। যখনই আমরা প্রকৃতির শক্তি ব্যবহার করি, তখন আমাদের অস্তিত্বের গল্প মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, আর তারাই আমাদের দেবতা মনে করে। আমাদের শক্তি অসীম, কিন্তু মহাসঙ্কট না এলে আমরা সাধারণের সামনে তা প্রকাশ করি না। নিয়ম ভাঙলে মহাবিশ্বের শাস্তি অনিবার্য। যতই শক্তিশালী হই না কেন, মহাবিশ্বের নিয়মের বাইরে কেউ নয়—কারণ সমস্তই এক মহাবিশ্বের অধীন।

স্বর্ণবিন্দু সিদ্ধ হলে, সেটি ভেঙে গড়ে ওঠে আত্মিক-দেহ—তখনই চতুর্থ স্তর, আত্মা-দেহ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তখন তুমি প্রায় অমর, যদিও অর্থাৎ চিরঞ্জীব নয়। তখন আয়ু হবে একশো কোটি বছর। আত্মিক-দেহ মানে তোমার দ্বিতীয় স্বত্তা, যা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে, রূপ বদলাতে পারে। যদি তোমার দেহ ধ্বংসও হয়, আত্মিক-দেহ নতুন শরীর গড়ে তুলতে পারে—তখন তোমার পরাজয় অসম্ভব, যদি না তোমার চেয়েও শক্তিশালী কেউ সামনে আসে। নইলে চাইলেও মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই।

—ক্রমশ প্রকাশ্য—

আপনাদের বন্ধু-স্বজনদের মাঝে এই কাহিনি ছড়িয়ে দিন, সকলে একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করুন। আপনাদের সুদৃঢ় সমর্থন ও উৎসাহ আমার কাম্য। কেউ উপহার বা সম্মাননা দিলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। দীর্ঘদিন ধরে আমাকে যারা ভালোবেসে পাশে থেকেছেন, সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।