অধ্যায় ছাব্বিশ: শরৎ উৎসব ও জাতীয় দিবসের আনন্দে
লিমিংফে এবং ঝিচি ফেনফাং রূপালি নগরীর বিপণিবিতানের দিকে এগিয়ে চলল। এই বিপণিবিতানটি হাজারতলা উঁচু, মেঘ ছুঁয়ে আছে, আর বাইরের সবটাই স্বর্ণাভ দেবপাথরে সাজানো, ঝকঝক করছে। এই বিপণিবিতানের মালিক হলেন এক মহাজাগতিক দেবতা, যিনি ছায়াপথের বাইরে অন্য গ্রহমণ্ডল থেকে এসেছেন; এটি তাঁর গ্যালাক্সি জুড়ে প্রতিষ্ঠিত এক শাখা। তবে এই মহাজাগতিক দেবতা খুবই কম আসেন এখানে, কারণ তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী, তাই তাঁর ব্যবসায় কেউ ঝামেলা করার সাহস করে না। কে-ই বা নিজের জীবন বিপন্ন করে তাঁর অনিষ্ট করবে? যদি কেউ তাঁকে বিরক্ত করে, তিনি বহু আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ থেকেও শত্রুকে ধ্বংস করতে পারেন, যদি না কেউ তাঁর চেয়েও শক্তিশালী হয়। তাই তাঁর বিপণিবিতানের প্রাচীর যতই মূল্যবান পাথরে সাজানো থাক, চোর-ডাকাতের সাহস নেই সেখানে হাত দিতে।
লিমিংফে এবং ঝিচি ফেনফাং পৌঁছল বিপণিবিতানের বিশাল দরজার সামনে। দু’জন সুন্দরী স্বর্গকন্যা হাসিমুখে স্বাগত জানাল, ‘‘আপনাদের স্বাগতম, রূপালি নগরীর বিপণিবিতানে, যা চাইবেন দেখে নিতে পারেন।’’
‘‘ধন্যবাদ,’’ লিমিংফে হাসল। সে ফেনফাং-এর হাত ধরে ভিতরে প্রবেশ করল। ভিতরে যেন এক বিশাল গম্বুজ—অত্যন্ত প্রশস্ত, আড়ম্বরপূর্ণ। এখানে মানুষের ভিড় লেগেই আছে, নানা জিনিস কেনাবেচা চলছে। বিপণিবিতানের কেন্দ্রে একটি মঞ্চ, সেখানে কয়েকজন অপূর্ব স্বর্গকন্যা গান গাইছে, নাচছে; সেই মধুর সুরে মন যেন বসন্তের বাতাসে ভেসে যাচ্ছে, শ্রবণে শান্তি।
লিমিংফে মনে মনে ভাবল, ‘‘এই মালিক সত্যিই ব্যবসা বোঝেন; কেউ কিছু না কিনলেও, এই স্বর্গীয় সুর শুনে মন আনন্দে ভরে ওঠে। এত উচ্চমানের সেবা পেয়েও কিছু না কিনলে লজ্জা লাগে; তাই কিছু না কিছু তো কিনতেই হবে।’’
প্রথম তলায় বিক্রি হচ্ছে ওষুধ ও অস্ত্র, দ্বিতীয় তলায় বর্ম ও সরঞ্জামাদি। তৃতীয় তলায় রয়েছে নানা গ্রহ থেকে সংগৃহীত উৎকৃষ্ট স্বর্গীয় ফল, যার সুবাসে গোটা তলাটাই ভরে আছে; গন্ধে জিভে জল আসে। এত সুন্দর ও সুগন্ধি ফল দেখে লিমিংফে অবাক; সে কখনও এত রকম ফল দেখেনি, নামও জানে না।
‘‘ফেইর, আমাদের আর ওপরে যেতে হবে না। দেখো, কত সুস্বাদু ফল! কিছু কিনে আমাদের চীন গ্রামের লোকজনের জন্য নিয়ে যাই, ওরা খুব খুশি হবে,’’ বলল ফেনফাং।
‘‘ঠিক আছে, ফাংআর। তুমি যা পছন্দ করো, তাই কিনো,’’ হাসল লিমিংফে।
‘‘এই ফলটা কী?’’ ফেনফাং জানতে চাইল।
এক স্বর্গকন্যা উত্তর দিল, ‘‘এটি বহির্জাগতিক স্বর্গগ্রহ থেকে আসা ‘সাত আত্মার রূপান্তর ফল’। এতে সাতটি ফলাত্মা আছে, রূপ বদলায়, একটিই খেলে হাজার বছরের সাধনা বাড়ে। এখন জাদু দিয়ে সিল করা হয়েছে, না হলে পালিয়ে যেত। একটি সাত আত্মার রূপান্তর ফলের দাম পঞ্চাশ লক্ষ সূর্য্যশুদ্ধি মুক্তা। এই ফল সদ্য এসেছে, স্থান-কাল পরিবহন চ্যানেলে আনা হয়েছে, এতে প্রচুর খরচ হয়েছে; তবে এত কম দামে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের বিষয়। এবার একটু বেশি এসেছে, না হলে শুধু পরিবহন খরচেই সব চলে যেত।’’
‘‘আরও সস্তা হবে না? আমরা তো অনেকটা নিতে চাই,’’ দর কষাকষি করল ফেনফাং।
‘‘আমাদের এখানে সদস্য কার্ড আছে—একশো কোটি সূর্য্যশুদ্ধি মুক্তা খরচ করলে সাধারণ সদস্য কার্ড, পাঁচশো কোটি হলে মধ্যম মানের, হাজার কোটি হলে স্বর্ণ সদস্য কার্ড, আর দশ হাজার কোটি হলে বিশেষ সদস্য কার্ড, তখন আমাদের গ্যালাক্সি শাখার ব্যবস্থাপক নিজে আপনাদের আপ্যায়ন করবেন; এর ফলে ৪০% ছাড় পাবেন।’’
‘‘তাহলে তো সমস্যা নেই,’’ বলল ফেনফাং। ‘‘ফেইর, তোমার কাছে কত আছে?’’
‘‘ফাংআর, তুমি নির্দ্বিধায় কিনো, যেটা ভালো লাগে,’’ আশ্বস্ত করল লিমিংফে।
‘‘স্বর্গকন্যা, এখানে সবথেকে ভালো কী কী আছে, একটু দেখিয়ে দাও না।’’
‘‘অবশ্যই, আসুন আমার সঙ্গে। এই পাশের সবটাই নতুন এসেছে, খেলে রূপ সুন্দর হবে, আয়ু বাড়বে। দেখুন, এই ফলটা সূর্য্য মণ্ডলের পৃথিবী গ্রাম থেকে আনা ‘আগুন ড্রাগন ফল’; সম্পূর্ণ লাল, স্বাদে অপূর্ব, মাংসে মিষ্টি। কথিত আছে, এক স্বর্ণড্রাগন স্বর্গীয় উন্নতির সময় প্রবল দুর্যোগে ব্যর্থ হয়ে, মহাবিশ্বের নিয়মে বারবার আঘাত পেয়ে, শেষমেশ পৃথিবী গ্রামে এসে পড়ে, তার দেহ মিশে যায় এক লাল ফলের সঙ্গে; সেই থেকে এ ফলের নাম আগুন ড্রাগন ফল। খেলে ফুসফুসের শক্তি বাড়ে, বাতাস শোষণে উপকার হয়।’’
লিমিংফে অবাক, ‘‘আমি তো পৃথিবীরই লোক, কখনও শুনিনি! যাক, নিজের গ্রামের জিনিস কিনে নিয়ে যাওয়াই ভালো, সবাইকে খেতে দেওয়া যাবে।’’
তারা অনেক ফল ও উৎকৃষ্ট মদ কিনে ফেলল।
‘‘ফেইর, এবার কি যথেষ্ট?’’ ফেনফাং জিজ্ঞাসা করল।
‘‘হ্যাঁ, যথেষ্ট,’’ হেসে উঠল লিমিংফে। ‘‘স্বর্গকন্যা, হিসেব করো তো, কত হল?’’
‘‘সম্মানিত অতিথি, মোট বিল হল নয়শো কোটি সূর্য্যশুদ্ধি মুক্তা। আপনার বিশেষ সদস্য কার্ডের ছাড়ে পরিশোধযোগ্য পাঁচশো চুয়াল্লিশ কোটি। অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন, আমাদের বিপণিবিতানের ব্যবস্থাপক আপনাদের নিজে বিদায় জানাবেন।’’
লিমিংফে পাঁচশো চুয়াল্লিশ কোটি সূর্য্যশুদ্ধি মুক্তা দিয়ে দিল। ঠিক তখনই ব্যবস্থাপক এলেন—‘‘সম্মানিত অতিথি, স্বাগতম! আমি গ্যালাক্সি শাখার ব্যবস্থাপক দাদাচি। আপনার কোনো চাহিদা থাকলে আগে জানাবেন, আমি অবশ্যই সংগ্রহ করে দেব, শুধু দাম দিন। এই নিন, আমার বার্তা পাঠানোর যন্ত্র—দৃশ্যমান জাদুক্রিস্টাল বল। যেখানেই থাকুন, কি চাইবেন বললেই হবে।’’
লিমিংফে বলটি নিয়ে নিজের মহাশক্তি আংটিতে রাখল। ‘‘ঠিক আছে, দরকার হলে যোগাযোগ করব। আপনি কি কখনও গ্রাহকের গ্রহ জানতে চান না?’’
‘‘না, আমরা সেটা জানতে চাই না। এতে সবার গোপনীয়তা বজায় থাকে। আমাদের ব্যবসা ভালোই চলছে।’’
‘‘সম্মানিত অতিথি, সংগীত শুরু হোক!’’ সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের সব স্বর্গকন্যা দুটি সারিতে দাঁড়াল, দাদাচি সামনে, পেছনে লিমিংফে ও ফেনফাং, চারপাশে স্বর্গীয় সংগীত বেজে উঠল।
অনেকে অবাক হয়ে দেখল, ‘‘ওরা কারা? কী অপূর্ব জুটি! এমন সুদর্শন যুগল লাখ বছরে একবারই দেখা যায়। নিশ্চয়ই অনেক সম্পদ আছে, না হলে দাদাচি নিজে এগিয়ে আসতেন না। তবে ওদের শক্তি কতটা, কে জানে? যদি কম হয়, আমরা তো সুযোগ নিতে পারি; আপাতত দেখে নিই।’’
এসব কথা লিমিংফের কানে এল। সে বিরক্ত হয়ে মৃদু গম্ভীর স্বরে ধ্যান জাগাল; সঙ্গে সঙ্গে যারা তাদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল, তারা বজ্রাঘাতে কাতর হয়ে, কান-নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল; অন্তত এক-দেড় বছর বিশ্রাম দরকার তাদের। তারা ভয়ে তাড়াতাড়ি পালাল। ‘‘এ লোকটা ভয়ানক! শুধু একটা শব্দে শরীর ভেঙে গেল!’’
লিমিংফে মনে মনে আরও কিছু কঠিন বাক্য ছুড়ে দিল, ‘‘আজ আমার ফেনফাং খুশি, না হলে তোদের কেউ বাঁচতে পারত না!’’
এরপর থেকে, ওইসব লোক লিমিংফে ও ফেনফাং-কে দেখলেই দূরে সরে যায়।
বিপণিবিতানের দরজার কাছে পৌঁছে দাদাচি বিদায় জানাল, ‘‘সম্মানিত অতিথি, আবার আসবেন।’’
‘‘নিশ্চয়ই, দরকার হলে যোগাযোগ করব। বিদায়, দাদা।’’
লিমিংফে ও ফেনফাং আকাশে উড়ে, দ্রুত ছুটে চলল পৃথিবী পথের চীন গ্রামের দিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে গেল চীন গ্রামে।
চীন গ্রামের পরিচিত স্থাপনা বর্তমানের ‘পুরাতন রাজপ্রাসাদ’—অত্যন্ত বিশাল ও শক্তিশালী, মেঘছোঁয়া, পৃথিবীর রাজপ্রাসাদের চেয়ে পাঁচশো গুণ উঁচু। গ্রাম জুড়ে বিস্তীর্ণ জনসমাগম।
লিমিংফে ও ফেনফাং মেঘ থেকে নেমে রাজপ্রাসাদের নিচে দাঁড়াল। মাথা তুলে দেখল প্রবেশদ্বারের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা ‘চীন গ্রাম’। এই গ্রাম গ্যালাক্সি শহরে পাঁচশো কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, সারাগ্যালাক্সির তুলনায় এটি ছোট নয়; এত গ্রহে এত স্বর্গবাসী, এখানে জায়গা কম নয়।
লিমিংফে প্রবল কণ্ঠে হাঁকাল, ‘‘চীন গ্রামের প্রিয়জনেরা, তোমাদের অভিবাদন জানাই!’’
তার আওয়াজ এত উচ্চ, যে কানে শোনার সামর্থ্য থাকলেই শোনা যায়।
‘‘কে বাইরে এত চিৎকার করছে? জীবে হাঁড়ি নেই?’’
‘‘আমরা সদ্য স্বর্গে উঠে আসা চীনা, শুনলাম এখানেই আমাদের বাসস্থান।’’
‘‘ঠিকই শুনেছ, এখানে আমাদের চীনা সমাজ। একটু অপেক্ষা করো, আমি সুরক্ষা বন্ধন খুলছি; ঢুকে পড়ো।’’
‘‘ধন্যবাদ। আপনারা কবে স্বর্গে উঠে এলেন, জানতে পারি?’’
একজন বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘‘তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করছ? হুম, মনে হয় চার-পাঁচ কোটি বছর তো হয়ে গেল।’’
‘‘আপনি কে, জানতে পারি?’’
‘‘দেবতা বলা চলে না, আমি দা-ইউ।’’
‘‘ওহ, আপনি সেই মহান জলনিয়ন্ত্রক দা-ইউ! বহুদিনের শ্রদ্ধা!’’
যা ঘটবে, জানতে হলে অপেক্ষা করো পরবর্তী পর্বের জন্য।
আপনাদের অনুরোধ, এই গল্পটি বন্ধু-পরিজনকে শেয়ার করুন, সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করুন। আপনাদের সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য অশেষ ধন্যবাদ!