একান্নতম অধ্যায়: জিনগত পরিবর্তিতকে হত্যা
তুষার কুড়িরা কি জানে, ছোট্ট মেয়েটির হৃদয়ে কী চলছে? তার হাত ধরে সে টেনে নিয়ে গেল, যেন জানে কোথায় যেতে হবে, অথচ মেয়েটি একবারও বাধা দিল না, চুপচাপ অনুসরণ করল। হাতে হাত রেখে, তারা বরফে পা রাখল, সেই ছলছল শব্দে দুজনের পথ এগোল। তুষার কুড়ি প্রতিবারই এমন নরম, যেন দু'জন মিলে মাটিতে আঁকা এক অদৃশ্য রেখা ধরে এগিয়ে চলে। হঠাৎ কোথাও থেমে গেলে, পেছনে তাকালে দেখা যাবে, যেখান দিয়ে গেছে, তুষার কুড়ি এখনও অক্ষত, কেবল দুটো ক্ষীণ ছাপ রয়ে গেছে। এই ছাপও অচিরেই মিলিয়ে যাবে, যেন কখনও কেউ এখানে আসেইনি।
তাদের চলার ছন্দ ছিল শান্ত, ধীর। তারা কোথায় যাচ্ছিল, কেন যাচ্ছিল, সে-সব যেন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছোট্ট মেয়েটির চোখে ছিল বিস্ময়, মাঝে মাঝে ভীরুতা, আবার কখনও একরাশ কৌতূহল। সে জানে না, তার হাত ধরে চলা যুবকটি কে, কিংবা কেন সে তার সঙ্গে যাচ্ছে। শুধু জানে, ফিরতে পারে না, যেতে হবে, সামনে যেতে হবে।
দূর পাহাড়ের কোলে, তুষারে ঢাকা এক অজানা জনপদে, তারা পৌঁছল এক বিশাল শূন্যতা জুড়ে। সেখানে কোনো শব্দ নেই, পাখির ডাক নেই, কেবল নীরবতা। তুষারের ওপর পড়া সূর্যের আলোয়, চারপাশে জ্যোতির্ময় রুপালি ছটা ছড়িয়ে আছে। এখানে, মনুষ্যজীবনের চিহ্ন নেই, নেই কোনো স্মৃতি, নেই কোনো ইতিহাস। কেবল তুষার ও নীরবতা। এই নীরবতা, এই শূন্যতা—মেয়েটি অনুভব করল, তার ভেতরেও কিছু যেন ফাঁকা হয়ে গেছে।
তাদের চলার গতি কমে আসে, যেমন কমে আসে দমকা হাওয়ার ঝাপটা। ছায়া দীর্ঘ হয়, পায়ের ছাপ ঘন হয়। তারা পথ হারায়নি, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে আরও গভীরে প্রবেশ করছে, অব্যক্ত এক গন্তব্যের দিকে। যুবকটি মাঝে মাঝে পেছনে তাকায়, মেয়েটির মুখ দেখে, আর মেয়েটি তার চোখে পড়ে থাকা ক্লান্তি, কৌতূহল বা অজানা শঙ্কা পড়তে পারে না।
তারা আরেকটু এগোলে, একেবারে বরফের কিনারে, যেখানে জমাট বরফে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, সেখানে এসে থামে। যুবকটি থেমে দাঁড়ায়, মেয়েটিকেও থামতে হয়। কেউ কিছু বলে না, কেবল শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। আশেপাশে, কেবল তুষার, নীরবতা, আর দূরের পাহাড়ের রেখা। এইখানে যেন সময়ও স্থবির।
হঠাৎ, দূরে কোথাও, এক পাথরের ওপর—যার গায়ে সূর্যরশ্মি পড়ছে—তারা দেখতে পায় একটি অদ্ভুত বস্তু। যুবকটি এগিয়ে যায়, মেয়েটি তার পিছু নেয়। কাছে গিয়ে দেখে, সে এক পুরনো অগ্নিশিখার চিহ্ন, আশেপাশে ছড়ানো কিছু ছাই, আর একজোড়া মলিন দস্তানা। কারা এসেছিল এখানে, তাদের স্মৃতি এখন কেবল এই ছাইয়ের মতোই ফিকে।
তারা আবার চলতে শুরু করে। সময়ের হিসাব হারিয়ে যায়, পায়ের ছাপও মুছে যায়। ধীরে ধীরে, নেমে আসে সন্ধ্যা। বরফের ওপর পড়ে থাকা ছায়া আরও লম্বা হয়, নীলচে আলোয় চারপাশ ছেয়ে যায়। মেয়েটি অনুভব করে, তার হৃদয়ে জমে থাকা শূন্যতা, নিস্তব্ধতা, আর একরাশ অজানা বিষাদ। সে জানে না, কেন যুবকের হাত ধরে এতদূর এসেছে, জানে না, ফিরে যেতে চায় কিনা। কেবল এক অদ্ভুত টান, এক নীরব আহ্বান তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তাদের চলার ছন্দে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কখনও তারা পাহাড়ি ঢালে ওঠে, কখনও নামে আবার। মাঝে মাঝেই থামে, বিশ্রাম নেয়, আবার হাঁটে। চারপাশে তুষার আর নীরবতা ছাড়া আর কিছু নেই। ডানপাশে এক ঝোপ, বামপাশে এক গিরিখাত। জীবনের চিহ্ন নেই কোথাও, কেবল নিঃশব্দ চলাচল।
হঠাৎ, মেয়েটি থেমে যায়। তার চোখে জল, ঠোঁটে এক অস্ফুট কাঁপন। যুবকটি তার দিকে ফিরে তাকায়, কিছু বলে না, শুধু মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরে রাখে। এই মুহূর্তে, তাদের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব নেই, কেবল এক অজানা বন্ধন, এক অগোচর বোঝাপড়া।
পাহাড়ের গায়ে, তুষারের চাদর পেরিয়ে, তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় দিগন্তের দিকে। তাদের পেছনে কেবল দুটো ক্ষীণ পায়ের ছাপ, যেগুলো শিগগিরই ঝড়ো হাওয়ায় মুছে যাবে, ঠিক যেমন তাদের স্মৃতি মিলিয়ে যায় অনন্ত বরফের দেশে।