তিপ্পান্নতম অধ্যায়: আমেরিকা সফর

বিশ্বজয়ী বীর বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক 3385শব্দ 2026-03-18 18:36:12

বাতাসে হালকা ঠাণ্ডার ছোঁয়া, দ্বিতীয় তলায় দরজাটা আস্তে করে খুলে দেখা গেল ভেতরে কেউ নেই। সম্ভবত সবাই কোথাও চলে গেছে, কেবলমাত্র পড়ার ঘর থেকে কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। প্রথম তলায় নামার পথে, নিস্তব্ধতা ঘিরে রেখেছিল চারদিক। এখানে ছোট্ট একটি উঠোন ছিল, সেখানে কয়েকটি পুরোনো গাছ, শীতকালীন সূর্যের আলোয় পাতাগুলো নরম হয়ে ঝুলছিল। উঠোনের মাঝখানে একটি পাথর বসানো ছিল, তার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল, হয়তো এটা কোনো অতিথি, হয়তো এই বাড়িরই কেউ।

শীতের সকাল, নিয়মিত কাজকর্মের জন্য সবাই তেমন ব্যস্ত নয়। তবে কেউ কেউ গৃহস্থালির কাজে লেগে আছে, কেউ কেউ আবার অলস সময় কাটাচ্ছে। দ্বিতীয় তলায় ফিরে আসার পথে সে দেখল, বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে—কেউ চা বানাচ্ছে, কেউ রান্নাঘরে কিছু প্রস্তুত করছে, কেউ আবার চুপচাপ জানালার ধারে বসে বই পড়ছে। শীতের সকালের এমন প্রশান্ত পরিবেশে, সবার মধ্যেই যেন একধরনের নিরবতা, স্বস্তি মিশে আছে।

বাড়ির পুরোনো আসবাবপত্র, ছোট ছোট টেবিলচেয়ার, কারু কাজ করা পর্দা, আর সাজানো গৃহসজ্জা যেন এক অনন্য সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এখানে অজানা অতিথিরা প্রায়ই আসে, আবার হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। কেউ কেউ বলে, এই বাড়ির কর্তা অনেক দিন আগেই শহরে চলে গেছেন, এখন তিনি আর ফিরে আসেন না। বাড়ির মধ্যবয়সী গৃহকর্ত্রী, তার হাসিমুখ, কোমল স্বভাব, অতিথিদের আপ্যায়নে সদা প্রস্তুত। কখনও তার সঙ্গে কথোপকথনে, কখনও বা কোনও গোপন হাসিতে, বাড়িটির পুরনো দিনের গৌরব যেন ফিরে আসে।

বাড়ির এক কোণায় রাখা বইয়ের তাক, সেখানে নানান বিষয়ের বই, পুরাতন পাণ্ডুলিপি, নোটবুক আর কিছু মলিন ছবি। সেসব পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে স্মৃতিরা উঁকি দেয়, কোথাও যেন ইতিহাসের গন্ধ মিশে আছে। কেউ কেউ বলে এখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে, রাতের বেলায় কখনও শাদা পোশাক পরা এক মেয়েকে দেখা যায়, সে নাকি কারও দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, আবার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।

বাড়ির নীচতলায় একটি প্রশস্ত ভাঁড়ার ঘর, সেখানে নানা রকমের জিনিসপত্র স্তূপ করে রাখা, বড় বড় পাথরের হাঁড়ি, মাটির কলসি, পুরনো কাঠের বাক্সে ভরা অজানা কিছু চিঠি। কেউ কখনও সেসব খুলে দেখে না, সেগুলো যেন স্মৃতির গহীন অরণ্যে হারিয়ে গেছে। বাড়ির পিছন দিকে ছোট্ট একটি বাগান, যেখানে শীতের ফুল ফুটে আছে। বাগানের এক কোণে ছোট্ট পাথরের বেঞ্চ, সেখানে বসে এক বৃদ্ধা মাঝেমধ্যে পুরনো দিনের কথা মনে করেন। হয়তো তিনি এ বাড়ির প্রথম বাসিন্দাদের একজন, হয়তো হারিয়ে যাওয়া কোনো অতিথি, যার প্রত্যাবর্তনের আশায় এ বাড়ি প্রতীক্ষা করছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে বাড়ির সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করে, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শীতের রাতের উষ্ণতায় মগ্ন হয়। তখন যেন পুরো বাড়িটা জীবন্ত হয়ে ওঠে, পুরনো দিনের স্মৃতি, হাসিকান্না, আনন্দ-বেদনা সবকিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি হয়।

এই বাড়ির প্রতিটি ইট, কাঠ, জানালা, পর্দা—সব কিছুতেই জমে আছে ইতিহাসের ধূলিকণা, ভালোবাসার চিহ্ন। নবাগত অতিথিরা এখানে এসে নিজেদের হারানো খুঁজে পায়, আবার কেউ কেউ নতুন করে স্বপ্ন দেখে। বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলে মনে হয়, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, ব্যর্থতা যেন এখানে এসে একটু আরাম পায়। কারও কারও মনে হয়, তারা হয়তো এখানে ফিরে আসবে, আবার কেউ চিরতরে বিদায় নেয়।

পুরনো দিনের সেই বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে, তার আঙিনায় প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আবার অস্ত যায়। কোনও এক শীতের সকালে কেউ এসে দরজায় টোকা দেয়, মৃদু হাসিতে অভ্যর্থনা জানায়, আবার কেউ চুপচাপ চলে যায়। এভাবেই জীবনের নাটক এখানে প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ হয়, স্মৃতি আর বাস্তবের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে।

লেখক পরিচিতির জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, এই বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও স্মৃতির চিহ্ন।