অধ্যায় ১১১: অস্ত্রোপচার
অধ্যায়: অস্ত্রোপচার
ইউয়ান-আঁধার বর্ষপঞ্জির ৩৭২ সাল।
কোলং প্রান্তর।
তিনশোরও বেশি বছর আগে সংঘটিত সেই মহাবিদ্রোহের পর মানুষ বাধ্য হয়েছিল ক্রমশ ফুলে ওঠা নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে গুটিয়ে নিতে।
বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের একমাত্র অবলম্বন প্রযুক্তি হারিয়ে, নিজেদের দুর্বল শরীরের ওপর নির্ভরশীল মানুষ দুঃস্বপ্নের পোকেমনদের অপরিমেয় শক্তির সামনে মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছিল।
যদি অল্পসংখ্যক পোকেমন নিজেদের চেতনা ধরে না রাখত, তবে মানুষ নামের এই জাতিটিও হয়তো আজ থেকে দুইশো বছর আগেই শত্রুর হাতে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
তবু তিনশোরও বেশি বছর কেটে যাওয়ার পরেও মানুষ পিঁপড়ের মতোই পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গর্তের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছে।
আর যে সমৃদ্ধ নগরাঞ্চল ও মনোরম জনপদ একসময় তাদের দখলে ছিল, সময়ের নির্মম ক্ষয়ে সেগুলোও একের পর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে—
দুঃস্বপ্নের ভেতর জন্ম নেওয়া ভয়ংকর দানবদের প্রজননক্ষেত্রে।
কোলং প্রান্তর তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আসলে, তিনশো বছর আগে এই জায়গাটির অন্য একটি নাম ছিল—‘কোলং শিকারাঞ্চল’।
তখন নিজেদের উন্মত্ত কৌতূহল ও নিয়ন্ত্রণের লালসা মেটাতে মানুষ বিপুল জনবল ও অর্থ ব্যয় করে নানা প্রজাতি ও অসংখ্য পোকেমন ধরে এনে এক জায়গায় বন্দি করত।
সেই স্থানকে তারা বলত ‘বন্য’ শিকারাঞ্চল।
আজ সেখানে অবাধে শিকার চালানো ও আমোদে মেতে থাকা মানুষগুলো বহু আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তাদের জায়গা নিয়েছে荒野 জুড়ে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য হিংস্র দুঃস্বপ্ন-পোকেমন।
তারা ক্ষুধায় কাতর হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে—চোখে পড়লেই যে কোনো তাজা মাংসের টুকরো।
আর এই মরুভূমিসদৃশ মৃত্যুভূমির গভীরে, নিঃশব্দে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এক বিশাল ঘাঁটি।
“ঠকঠক, ঠকঠক।”
দ্রুত পদধ্বনি দীর্ঘ অন্ধকার করিডরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, যেন তার মালিকের উৎকণ্ঠারই পূর্বাভাস দিচ্ছে।
লোকটি দেখতে মার্জিত এক তরুণ। রোগাটে শরীরে সাদা পরীক্ষাগারের পোশাক, চারপাশে তীব্র ও নাকে ঝাঁঝ ধরানো ওষুধের গন্ধ। মাঝারি লম্বা কালো চুল যত্ন করে দুদিকে আঁচড়ানো। উঁচু নাসার ওপর বসানো কালো ফ্রেমের চশমা। বোতলের তলার মতো পুরু কাচও তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর কালো চোখের কালি ঢাকতে পারেনি।
করিডরের ম্লান আলোয় মার্জিত তরুণটি হাতে ধরা কাগজের প্রতিবেদন পড়তে পড়তে দীর্ঘক্ষণ এক ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে ব্যথা হয়ে যাওয়া কাঁধে হাত বুলিয়ে নিল।
বাঁ হাত তুলে কবজিতে বাঁধা পুরোনো ধাঁচের ঘড়িটির দিকে এক ঝলক তাকিয়েই সে পা আরও দ্রুত চালাল।
অবশেষে করিডরের শেষপ্রান্তে থাকা কালো লোহার দরজার সামনে এসে সে থামল।
তর্জনী ও মধ্যমা বাঁকিয়ে ঠান্ডা ধাতব পৃষ্ঠে আলতো করে টোকা দিল।
“টক টক টক।”
আঙুলের গাঁট থেকে ভোঁতা শব্দ বেরিয়ে এল।
কোনো সাড়া নেই।
পুরো করিডর আবার নীরবতায় ডুবে গেল।
মার্জিত তরুণটির মুখে অধৈর্যের ছাপ ফুটে উঠল। সে আবার ডান হাত তুলতে যাচ্ছিল—
“কড়রর!”
ধাতব ঘর্ষণের তীক্ষ্ণ শব্দ উঠল। কালো লোহার দরজায় হঠাৎ একটি সরু লম্বা ফাঁক দেখা দিল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে রক্তাভ শিরায় ভরা একজোড়া চোখ ভয়ংকর ভঙ্গিতে ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল।
ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে সেই আতঙ্কজনক চোখদুটি মার্জিত তরুণটির শরীরের ওপর দিয়ে একবার বয়ে গেল।
ঠাস—
ফাঁকটি ঝট করে বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর শোনা গেল যন্ত্রচালনার মতো ধাতব শব্দ।
কড়কড় আওয়াজ তুলে ভারী লোহার দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
হলদে আলো যেন দিগন্তের ভোরের মতো ঘরের অন্ধকার ও নোংরামি উন্মোচন করে দিল।
মার্জিত তরুণটির চোখে প্রথমেই পড়ল কুঁজো হয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধের অবয়ব।
মাথার অর্ধেক প্রায় টাক; দুপাশে ছড়িয়ে থাকা অল্প কিছু সাদা চুল এলোমেলোভাবে ঝুলে আছে। মুখজুড়ে স্তরে স্তরে ভাঁজ, ভেতরের দিকে বসে যাওয়া গাল দাঁতের মাড়ির রেখাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
চোখদুটি গভীরভাবে কোটরে ঢুকে গেছে। কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই রক্তাভ ভয়ংকর চোখের মালিকই এই বৃদ্ধ।
হাতে থাকা প্রতিবেদনটি কুঁজো বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মার্জিত তরুণটি অন্ধকার ঘরের ভেতর তাকাল।
কাচের পৃষ্ঠে দুর্বল আলো ফ্যাকাশে রেখা এঁকে দিচ্ছে। হালকা সবুজ তরল থেকে বমি উদ্রেককারী গন্ধ বেরোচ্ছে, আর তার ভেতর থেকে সাদা বুদ্বুদ উঠে আসছে।
ঘরজুড়ে অর্ধগোলাকার অসংখ্য পাত্র, সবকটি ঘন সবুজ তরলে পূর্ণ। তার ভেতরে নানা আকৃতির কালো ছায়া নিশ্চুপ ভেসে আছে।
আলো ম্লান হলেও আবছাভাবে বোঝা যায়, সেগুলো ছোট ছোট পোকেমনের আকৃতি।
মনে হয় যেন দীর্ঘদিন ধরে জীববৈজ্ঞানিক নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা কোনো গুদামঘর। পচা বাতাসে শরীর অস্বস্তিতে কুঁকড়ে ওঠে।
“সম্প্রতি… তোমাদের আবেদনের হার… একটু বেশিই দ্রুত হয়ে গেছে।”
কর্কশ কণ্ঠটি যেন পাথরের জাঁতার ঘর্ষণের শব্দ।
কুঁজো বৃদ্ধ চোখ সরু করে শুকনো ডান হাতে কলম ধরে প্রতিবেদনের ওপর কিছু লিখতে লাগল।
উদাসীন ভঙ্গিতে মার্জিত তরুণটি নিজের চুল ঠিক করল।
“কী করা যাবে, সম্প্রতি ডক্টর দারের পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
“সবকিছু ঠিকঠাক চললে এক মাসের মধ্যেই ফল পাওয়া যাবে।”
“সফল হলে সদর দপ্তরের লোকেরা… হেহে।”
সামনে দাঁড়িয়ে অনর্গল কথা বলে চলা মার্জিত তরুণটির দিকে চোখের কোণ দিয়ে তাকিয়ে কুঁজো বৃদ্ধ ঠোঁটের কোণে অবজ্ঞার হাসি ফুটিয়ে বলল,
“সেটাই ভালো।”
কথা শেষ করে স্বাক্ষর করা প্রতিবেদনটি মার্জিত তরুণটির বুকে ছুড়ে দিল।
তারপর কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের খর্বকায় দেহটিকে ঘন অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল।
ছায়ার মধ্যে শুধু রক্তলাল, ভয়ংকর চোখদুটি নিঃশব্দে পলক ফেলতে লাগল।
প্রতিবেদনটি অনায়াসে বুকের ভেতর গুঁজে নিয়ে মার্জিত তরুণটি যেন বাজারে ঘুরে বেড়ানোর মতো পোকেমনের নমুনায় ভরা ঘরটির মধ্যে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
ডক্টর দারের নির্দেশ মনে করে দুটি উপযুক্ত পোকেমন বেছে নেওয়ার পর সে পাখির খাঁচা বহন করার মতো করে দুটি কাচের পাত্র তুলে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে অন্ধকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
তার পেছনে ভারী লোহার দরজাটি কর্কশ ধাতব ঘর্ষণের শব্দে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
কালো ছায়ার মধ্যে রক্তলাল ভয়ংকর চোখদুটি গভীর লোভে জ্বলছিল।
সেগুলো সামনের তরুণটির দূরে সরে যাওয়া পিঠের দিকে স্থির হয়ে রইল।
…
…
“বিপ বিপ।”
নিখুঁত যন্ত্রটি নিয়মিত শব্দ করে চলেছে। জীবনের প্রতীক সবুজ রেখা তরল-স্ফটিক পর্দায় ওঠানামা করছে।
বিভিন্ন পুরুত্বের সাদা নলগুলো যেন জট পাকানো পশমের গোলার মতো একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, তারপর পাশের দিকে ছড়িয়ে গেছে।
সেখানে একটি সাধারণ লোহার মঞ্চ।
মসৃণ ধাতব পৃষ্ঠে ঠান্ডা আলো ঝলমল করছে।
তীব্র জীবাণুনাশকের গন্ধ ভারী বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে।
ধাতব মঞ্চের ওপর একটি সাধারণ ম্যাকপ চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।
তার ধূসর, শক্ত চামড়ায় এখনও নমুনা-পাত্রের ঘন সবুজ আঠালো তরল লেগে আছে।
কবজি, গোড়ালি, এমনকি গলাও শক্ত ধাতব বন্ধনী দিয়ে মঞ্চের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।
চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনে সম্পূর্ণ সাদা লম্বা পোশাক, মুখে মুখোশ।
অস্ত্রোপচারের আগের শেষ প্রস্তুতি জোরকদমে চলছে।
অস্ত্রোপচারকক্ষের কাচের দেয়ালের বাইরে একজন রোগাটে মধ্যবয়স্ক পুরুষ বুকের ওপর দুহাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার গম্ভীর মুখে প্রত্যাশার ছাপ স্পষ্ট।
মাথার ওপর মুরগির বাসার মতো এলোমেলোভাবে ঝুলে থাকা ধূসর-সাদা চুল। সারা বছর পরীক্ষাগারে বন্দি থেকে সূর্যের আলো না দেখা ফ্যাকাশে মুখে রক্তের লেশমাত্র নেই।
গভীর সবুজ চোখের মণিতে বিজ্ঞানীদের স্বভাবসিদ্ধ উন্মত্ততার ক্ষীণ ঝিলিক।
“ডক্টর দার, প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।”
পাশ থেকে সহকারীর সাবধানী কণ্ঠ ভেসে এল।
তিনি মৃদু মাথা নাড়লেন।
“শুরু করো।”
ডক্টর দারের কণ্ঠে হালকা কাঁপুনি ছিল।
পরীক্ষাগারের ভেতর সাদা পোশাক পরা কর্মীরা ব্যস্ত পায়ে চলাফেরা শুরু করল।
ঠান্ডা লোহার শয্যার সামনে সংক্ষিপ্ত ও দৃঢ় নির্দেশ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
“অস্ত্রোপচার শুরু।”
“জীবনরক্ষাকারী তরল প্রবেশ করানো সম্পন্ন।”
“নিদ্রাযন্ত্র বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।”
“বিচ্ছিন্নকরণ সফল।”
“জাগরণ-গ্যাস প্রবেশ করাও।”
“প্রবেশ করানো সম্পন্ন।”
ফুঁ—
নির্দেশদাতার মতো দেখতে সাদা পোশাকের লোকটি মুখোশের আড়াল থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
এরপর ঘরের কোণে রাখা লোহার আলমারি থেকে সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি বেগুনি-লাল রঙের পরীক্ষানল বের করল।
কাচের নলের ভেতর কুয়াশা আর তরলের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত পদার্থ ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে।
মনে হয় যেন নরক থেকে উঠে আসা কালো মেঘের দল অতল গহ্বরের মৃত সাগরে ডুবে আছে।
ঘন অশুভ আভা সেই বেগুনি-লাল পদার্থের সঙ্গে কাচের নলের ভেতর উন্মত্তভাবে পাক খাচ্ছে।
সাদা পোশাকের শল্যচিকিৎসকের সুরক্ষাচশমার আড়ালে থাকা চোখে দৃঢ়তার ঝলক ফুটে উঠল।
“গেঙ্গারের লালারসের নির্যাস প্রবেশ করাও!”