দ্বাদশ অধ্যায়: গুপ্তচর, গুপ্তচর, আবারও গুপ্তচর!
ভিতরে প্রবেশ করা মানুষটি স্বভাবতই ছিল ওয়েস্কার, তবে আসলেই যে কারণে ঘরে উপস্থিত সবাই উচ্ছ্বাস থামিয়ে দিল, সেটি ছিল ওয়েস্কারের সঙ্গে আসা সেই ব্যক্তি।
ব্রায়ান আইরনস, র্যাক্কুন শহর পুলিশ বিভাগের কমিশনার।
খাটো, মোটা, মুখে চর্বির তেল চকচক করছে, যেন মুখে বড় অক্ষরে লেখা—‘আমি দুর্নীতিগ্রস্ত’!
প্রথম দেখাতেই তার সম্পর্কে কারো ভালো ধারণা হয় না।
কমপক্ষে হান জি-লিন পুলিশ বিভাগে যোগ দেয়ার পর যতদিন কাটিয়েছে, ততদিনে সে অনেকবার শুনেছে—লোকজন তার সম্পর্কে ফিসফিস করে বলে, তার চরিত্র সন্দেহজনক।
তবু যাই হোক, তিনিই তো র্যাক্কুন শহর পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা।
ব্রায়ানকে ঘরে ঢুকতে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াল, ‘‘কমিশনার।’’
ব্রায়ান হাসিমুখে হাত নেড়ে বললেন, ‘‘বসে পড়ো, বসো। শুনেছি এস.টি.এ.আর.এস-এ নতুন সদস্য এসেছে, ঠিক ওয়েস্কারও আসছিল, তাই আমি সাথে এলাম দেখে যেতে।’’
এক ঝলকে তাকিয়ে ব্রায়ান চোখে পড়ল রেবেকার মূর্তি, সুন্দর নির্মল মুখশ্রী, মুহূর্তেই তার চোখে আলোর ঝিলিক, রেবেকার দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘‘নিশ্চয়ই এই মেয়ে আমাদের নতুন সদস্য?’’
বলেই ব্রায়ান তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রেবেকার পাশে বসলেন।
ঠিক হান জি-লিনের আগের আসনটিতে।
দেখলে মনে হয় যেন তিনিও রেবেকার সঙ্গে প্রথমবারই দেখা করছেন।
অবশ্য, এটি প্রথমবারই বটে, তবে প্রশ্ন হলো, পুলিশ বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তা হয়ে নতুন সদস্যের খবর জানেন না, তা কি হয়?
তার চেয়ে বড় কথা, এস.টি.এ.আর.এস তো একটি বিশেষ বাহিনী।
নিশ্চয়ই রেবেকার তথ্য আগে থেকেই তার ডেস্কে ছিল।
তবু ব্রায়ান এমন ভাব করলেন যেন রেবেকাকে প্রথম দেখছেন, কৃত্রিম মমতায় রেবেকার হাত ধরলেন, টুপটাপ চাপতে চাপতে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘মেয়ে, কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এসেছো?’’
মাত্র আঠারো বছরের রেবেকা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি কখনও, কিছু বোঝার আগেই তার হাত চেপে ধরেছে লোকটা, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সে হাত ছাড়াতে চাইল, কিন্তু ব্রায়ান শক্ত করে ধরে রাখলেন, ছাড়াও যায় না, না ছাড়াও যায় না, অস্বস্তি চেপে রেখে সে উত্তর দিল, ‘‘কমিশনার, র্যাক্কুন শহর বিশ্ববিদ্যালয়।’’
‘‘তাহলে তুমি তো স্থানীয়, বয়স কত?’’
কথার ফাঁকে ব্রায়ান প্রথমে শুধু হাতে চাপ দিচ্ছিলেন, এরপর সরাসরি রেবেকার হাতের উপর হাত রাখলেন।
রেবেকার ঠোঁটের কোণে অসহায় টান, বারবার হাতের দিকে চাইল, ‘‘আঠারো বছর।’’
‘‘এত ছোট? তাহলে তো আমাদের বাহিনীতে একেবারে প্রতিভাবান তরুণী এসেছে।’’
এরপর শুরু হলো ঘরোয়া কথাবার্তা, শুনতে যতই সদয় লাগুক, ঘরে উপস্থিত অনেকেই আসল অভিপ্রায় বুঝে গেল, ভ্রু কুঁচকালো।
বিশেষত জিল, মুখে অসন্তোষ, কয়েকবার কিছু বলতে চেয়েও কমিশনারের পদমর্যাদার কারণে চুপ থাকল।
শুধু হান জি-লিন, চোখের কোণে ওয়েস্কার আর ব্রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু একটা ভাবছে।
দু’জন একসাথে এলেন?
এ কি কাকতালীয়?
নাকি...
হান জি-লিনের এভাবে সন্দেহ করা উচিত না।
কিন্তু ভাবতে গিয়ে তার মনে হলো, র্যাক্কুন শহরের পুলিশ প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজন মানুষ, এবং এত বছর ধরে নির্ভয়ে বসে আছে!
হান জি-লিন যেন গন্ধ পেল পচা আমলাতান্ত্রিকতার।
আর ওয়েস্কারও সবসময় নির্লিপ্ত, কেবল চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
এসব দেখে হান জি-লিন ভাবল, এবার হয়তো তাকে একটু নির্বোধ সাজতে হবে।
রেবেকা তো প্রায় কাঁদার মতো অবস্থা—
‘‘কমিশনার, আপনি কিন্তু আমার আসনে বসেছেন।’’
শুনে ব্রায়ান একটু থমকাল, মাথা তুলে দেখল, কখন যেন হান জি-লিন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ব্রায়ান মুখ কুঁচকাল—এ কেমন বোকা ছেলে, বুঝতে পারে না কি, বস বড়দের কেমন খেয়াল রাখে?
হান জি-লিনও যেন সত্যিকারের বোকাটে, শক্ত হয়ে ব্রায়ানের পেছনে দাঁড়িয়ে, বোঝানোর জন্য চেয়ারের পেছনে ঝোলানো কোট দেখাল।
ওটা সে খুলেছিল জিলের সঙ্গে হাতাহাতির আগে।
সবকিছু স্পষ্ট।
তখনই ব্রায়ান মনে করতে পারল, এই এশীয় মুখ—তিন সপ্তাহ আগে এস.টি.এ.আর.এস-এ নতুন যে সদস্য এসেছে।
মনে আছে, নাম ‘হান’।
এত বোকা, পুলিশ বিভাগে এল কেমন করে?
মনে কষ্ট পেলেও, হান জি-লিনের ইঙ্গিত এত স্পষ্ট দেখে আর বসে থাকা চলে না, রেবেকার হাত ছেড়ে দিল।
বাইরে বাইরে ব্রায়ান হাসিমুখে বলল, ‘‘আহা, দুঃখিত, তোমার নাম হান না? ক্ষমা চাইছি, আমি কেবল দেখতে এলাম, এখনই চলে যাচ্ছি।’’
মুখে এসব বললেও মনে মনে হান জি-লিনকে কড়া মনে রাখল।
তারপর ব্রায়ান উঠে দাঁড়িয়ে রেবেকার কাঁধে চাপড় দিল, ‘‘ভালো করে কাজ করো, তরুণী, এত অল্প বয়সেই এস.টি.এ.আর.এস-এ, তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল!’’
ব্রায়ান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রেবেকা যেন মুক্তি পেল, হান জি-লিনের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল।
ব্রায়ানের হাতে আটকে থাকা সময়টা তার কাছে যেন যুগের সমান লেগেছে।
ওদিকে হান জি-লিন শুধু হালকা হাসল, তবে সানগ্লাসের আড়ালে তার দৃষ্টি পড়ে রইল ওয়েস্কারের ওপর।
সে লক্ষ করল, যখন সে ব্রায়ানকে সরাতে গেল, ওয়েস্কারের মুখে এক ঝলক অস্বস্তি ফুটে উঠল।
এই তো!
হান জি-লিনের মনে পরিষ্কার হলো।
দেখা যাচ্ছে, আমব্রেলা কোম্পানি শুধু ওয়েস্কারকেই নয়, আরও লোককে র্যাক্কুন শহর পুলিশের ভেতরে ঢুকিয়েছে।
এমনকি আমাদের প্রিয় শুয়োর-কমিশনারও।
অবশ্য, সবচেয়ে সম্ভাব্য হলো, আমব্রেলা কোম্পানি ব্রায়ানকে কিনে নিয়েছে।
আসলে তফাৎ নেই।
আচ্ছা, আরেকটা কথা—প্রায় ভুলে যাচ্ছিল, সে নিজেও তো এক সময়কার ছোটখাটো গুপ্তচর।
এসব ভেবে হান জি-লিন হঠাৎ অনুভব করল, এস.টি.এ.আর.এস-এর অবস্থা কতটা করুণ।
মনে আছে, এই দলটা শিগগিরই আমব্রেলা কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে।
কিন্তু সহকর্মীরা আমব্রেলাপন্থী, সরাসরি বসও তাদের লোক, এমনকি পুরো পুলিশ বিভাগের বড়বাবুও সেই পক্ষের।
গেম না খেলেও, এই মুহূর্তে হান জি-লিন যেন দেখতে পেল, এস.টি.এ.আর.এস-এর সামনে কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
...
রাত ঘনিয়েছে, বাগান নীরব।
ঘন ছায়া-ঢাকা অরণ্যের নিচে অস্পষ্ট কথোপকথনের শব্দ ভেসে এল।
‘‘তোমার আজকের আচরণটা অস্বাভাবিক ছিল।’’
‘‘আমি ওই মোটা লোকটাকে সহ্য করতে পারি না।’’
‘‘সে কমিশনার।’’
‘‘একটা কুকুর ছাড়া কিছু না।’’
‘‘মনে মনে জানলে হবে না, বাইরের আচরণে আমাদের যথেষ্ট সম্মান দেখাতেই হবে।’’
‘‘চেষ্টা করব।’’
কিছুক্ষণ নীরবতার পর আবার কথা শোনা গেল।
‘‘কেমন চলছে?’’
‘‘পুলিশ বিভাগ সম্ভবত কিছু নথি গোপন রাখবে।’’
‘‘তা জানি, আমি এস.টি.এ.আর.এস-এর কথা জানতে চাচ্ছি।’’
‘‘দেখে মনে হচ্ছে, তারাও হাত গুটিয়ে নিচ্ছে।’’
‘‘এটা তো ভালো খবর, আর কিছু?’’
‘‘বন্যপশুর আক্রমণের ঘটনা?’’
‘‘কি?’’
‘‘শহরতলীতে একটি লাশ পাওয়া গেছে, খুব করুণ অবস্থা, মনে হচ্ছে কোনো বন্য জন্তু খেয়েছে।’’
অনেকক্ষণ চুপ থেকে অপর প্রান্তের কণ্ঠ বলল, ‘‘এ বিষয়ে নতুন কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’’
সঙ্গীর দুরে সরে যাওয়া ছায়ার দিকে তাকিয়ে, সানগ্লাসের আড়ালে ঝলসে উঠল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।