একাত্তরতম অধ্যায়: আবারও অদৃশ্য

অদ্ভুত ভাগ্যের সাপ-সম্বর্ষিণী স্ত্রী জলকাঠি হান 3636শব্দ 2026-03-06 15:01:32

এবার সাদা চিহ্ন আমার হাত ছেড়ে দিয়ে খুব গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘‘আলিয়ান, আমাকে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হবে, এই সময়টা তোমাকে লিউ ইরান রক্ষা করবে। ওর ক্ষমতা যদিও খুব বেশি নয়, তবে এখনকার ওই সব মামুলি সমস্যা সামলাতে ওর পক্ষে যথেষ্ট।’’

লিউ ইরান একটু ক্ষুব্ধ হলেও, আগের মতো সোজা আক্রমণ করল না—শান্ত স্বরে বলল, ‘‘তুমি এত বড় আঘাত পেয়েছ, বিশ্রাম না নিয়ে বাইরে ছুটে বেড়াচ্ছ, এবার বুঝতে পেরেছ কী অবস্থা! অথচ আমার ক্ষমতা নিয়ে ঠাট্টা করছ? তুমি কি এখনো মনে করো, তুমি সেই অতীতের অজেয় দেবতা?’’

আমার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল—তবে কি সাদা চিহ্ন আহত?

সাদা চিহ্ন আমার উদ্বেগ টের পেয়ে তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা দিল, ‘‘চিন্তা কোরো না, কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, লিউ ইরান শুধু বাড়িয়ে বলছে।’’

আমি ওর কথায় আর আশ্বস্ত হতে পারলাম না, ওর হাত ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম, কষ্টে বললাম, ‘‘কোথায় আঘাত পেয়েছ, কিভাবে?’’

সাদা চিহ্ন যেন আমার উদ্বেগে বেশ খুশি, হালকা হাসল, আমার হাত নিজের বুকের উপরে রেখে বলল, ‘‘আমার হৃদয়টা ব্যথা করছে...’’

এই সাপটা আবারো নির্লজ্জ হয়ে উঠল; সামনে লিউ ইরান আছে দেখে আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম, কিন্তু ও এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে, চোখ আধা বোজা, যেন আবেগ ধরে রাখতে পারছে না—আমি তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে ওর বাহুতে জোরে একটা চড় মারলাম, বিরক্ত গলায় বললাম, ‘‘তুমি তো পুরো厚脸皮...’’

কিন্তু চড় মারার মুহূর্তেই দেখলাম, আমার হাতটা ওর শরীরের ভেতর দিয়ে চলে গেল—ঠিক যেন বাতাস ভেদ করে যাচ্ছে, কোনো অনুভূতিই নেই।

কিছুক্ষণ আগেও তো ও আমার জোরে জড়িয়ে ধরেছিল, এখন হঠাৎ এমন হল কেন?

বিষ্ময়ে চোখ তুলে সাদা চিহ্নের দিকে তাকালাম, ‘‘তোমার কী হয়েছে?’’

‘‘কিছু না, একটু কেবল ক্লান্ত, বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে!’’ সাদা চিহ্ন আমার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু পারল না—কেবল একটা ক্লান্ত হাসি দিয়ে রইল।

আমি জানতাম, ও সবসময় একটা ছায়ার মতো ছিল, কিন্তু তবুও আমি ওকে ছুঁতে পারতাম, ওর শরীরে উষ্ণতা পর্যন্ত অনুভব করেছিলাম। এখন হঠাৎ করে ও এমন স্বচ্ছ হয়ে গেল কেন?

আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লিউ ইরান পাশে বলল, ‘‘এতটা জোর খাটিও না, তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নাও, আলিয়ানকে আমি দেখে রাখব। আসলে তোমার অনুপস্থিতিতেই ও হয়তো আরও নিরাপদ থাকবে!’’

আমি রাগে লিউ ইরানের দিকে তাকালাম, এসব কথা শুনলে কার না রাগ হয়! তাছাড়া সাদা চিহ্ন কবে কারো এমন কথা সহ্য করেছে?

কিন্তু সাদা চিহ্ন কিছু বলল না, শুধু আমার দিকে একগোল কোমল দৃষ্টি ছুঁড়ে, ঠোঁটের কোণে ফিকে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘‘আলিয়ান, আমার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ো না।’’

আমি কিছু বোঝার আগেই ওর অবয়ব ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল, শেষে একেবারে মিলিয়ে গেল।

‘‘সাদা চিহ্ন...’’ আমি হাত বাড়ালাম, ওকে ধরতে চাইলাম, কিন্তু কিছুই ধরতে পারলাম না।

উন্মাদের মতো ওর নাম ধরে ডাকতে লাগলাম, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। চোখ থেকে নির্দয় অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, বুকের মধ্যে ধারালো যন্ত্রণা, গলা শুকিয়ে আসছিল।

লিউ ইরান এগিয়ে এসে একগ্লাস জল ঠোঁটে ধরল; দু’চুমুক খাওয়ানোর পর শান্ত গলায় বলল, ‘‘আলিয়ান, সাদা চিহ্ন মারাত্মক আহত, অনেকদিন ধরেই বিশ্রাম নিচ্ছিল। কিন্তু তোমার বিপদ আঁচ করে নিজের ক্ষতি জেনেও বেরিয়ে এসেছিল। একটু আগেই আবার নিজের আত্মশক্তি খরচ করে জিয়াং লিনফেং-এর বিষ কাটিয়েছে। এখন ওর শক্তি এতটাই ফুরিয়ে গেছে যে আর দৃশ্যমান থাকতে পারছে না। তাই, আপাতত ও তোমার শরীরেই ফিরে গেছে।’’

আগে সাদা চিহ্ন সবসময় এমনটা দেখাত, যেন দুনিয়ার কোনো বাধাই ওর কাছে কিছু নয়—তাতে আমি বিশ্বাস করতাম, ও অজেয়, কেউ ওকে আঘাত করতে পারবে না। কিন্তু এসব কেবল আমাকে উদ্বিগ্ন না করার জন্য ওর অভিনয় ছিল।

বাস্তবতা—এখন ওর আত্মশক্তি দৃশ্যমান থাকার মতোও নেই।

‘‘ওকে এতটা আহত করল কে? ও তো এমনকি কৃত্রিম পাহাড়ের দেবতাকেও ভয় পায় না! বরং এবার তো আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ছিল। কে আছে দুনিয়ায়, যে ওকে আঘাত করতে পারে?’’ আমি লিউ ইরানের দিকে চিৎকার করলাম।

লিউ ইরান আমার ভগ্নদশা দেখে এগোতে চাইল, কিন্তু আমার সামনে এসে থেমে গেল, গভীর দৃষ্টিতে বলল, ‘‘আলিয়ান, ভবিষ্যতে জানতে পারবে—সাদা চিহ্ন ততটা সর্বশক্তিমান নয়।’’

আমি জানতাম, ওরও নিশ্চয় কোনো শত্রু আছে, নইলে ওর গর্ব আর ক্ষমতা দিয়ে সামনে আমার সামনেই এভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত না। আবার নিজের শরীরের দাগের কথা মনে পড়ে গেল, জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘সাদা চিহ্ন কেন আবার সিলমোহরে ফিরে গেল? বাইরে কোথাও বিশ্রাম নিতে পারত! যদি ওখানে গিয়ে আর জাগতে না পারে?’’

লিউ ইরান কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্ভার গলায় বলল, ‘‘এখন তোমার শরীর ওর কাছে আর কোনো শৃঙ্খল নয়—বরং বিশ্রামের আশ্রয়।’’

আমার মাথায় অজস্র প্রশ্ন ঘুরছিল, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

সত্যি বলতে, এখন অনেক কিছুই আমার বোধগম্যতার বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু এই দুই সাপ ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করব, সেই ভরসা নেই।

আমার শরীর যদি সাদা চিহ্নের জন্য আর কারাগার না হয়ে বিশ্রামের জায়গা হয়, তবে সেটা তো ভালোই। অন্তত আমি ওকে সাহায্য করতে পারব।

তবু, সাদা চিহ্ন জানে জিয়াং পরিবারের সঙ্গে কালো ছায়াদের সম্পর্ক আছে, তবুও কেন নিজের সব শক্তি দিয়ে জিয়াং লিনফেং-এর বিষ কাটাল? তবে কি লিনফেং-এর বিষের সঙ্গে সাদা চিহ্নেরও সম্পর্ক রয়েছে?

তবে কি জিয়াং পরিবার সাদা চিহ্নকে নিয়ে কতটা জানে?

‘‘লিউ ইরান, সত্যিটা বলো, কী করলে সাদা চিহ্ন পুরোপুরি সেরে উঠবে?’’ আমি কান্নায় ভেজা চোখে ওর দিকে তাকালাম, কিছু উত্তর পাওয়ার আশায়।

লিউ ইরান কেবল হালকা গলায় বলল, ‘‘চিন্তা করো না, তুমি থাকলে ওর কিছু হবে না।’’

আমি চোখ মুছে বললাম, ‘‘আরও স্পষ্ট করে বলো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!’’

‘‘আলিয়ান, সাদা চিহ্ন নিজেই সুস্থ হয়ে উঠবে, শুধু সময় লাগবে। এখন ও তোমার শরীরে, কালো ছায়ারা ভেবে নিচ্ছে ও সিলমোহরে বন্দী, তাই ওদের হুমকি নেই। এই সময়টা তুমি ভালো করে পড়াশোনা করো। জিয়াং পরিবার ডেকেছে তো যাও, ওদের উদ্দেশ্য যাই হোক, আমি আছি—ভয় পেও না।’’

লিউ ইরানের কথায় মন কিছুটা হালকা হল—সাদা চিহ্ন সুস্থ থাকলেই হল।

জিয়াং পরিবারে কোনো ষড়যন্ত্র থাকলে পরে দেখা যাবে। কালো ছায়াদের উদ্দেশ্য সাদা চিহ্নকে সিলমোহরে আটকে রাখা; সাদা চিহ্ন বের না হলে ওরাও কিছু করবে না।

আমি লিউ ইরানকে মাথা নেড়ে ক্লান্ত শরীরে স্নানে গেলাম। টবের মধ্যে শুয়ে সাদা চিহ্নের কথা মনে পড়ল, মনে পড়ল ও প্রথমবার আমার সামনে কীভাবে এসেছিল—মুখটা গরম হয়ে উঠল।

কলারবোণের ওপরের সাদা সাপের দাগে হাত বুলিয়ে মনে মনে বললাম, ‘‘সাদা চিহ্ন, তুমি ভালো করে বিশ্রাম নাও, আমি নিজের যত্ন নেব, তোমাকে আর সমস্যায় ফেলব না! আর তোমার উল্টো আঁশ, আমি অবশ্যই খুঁজে বের করব!’’

স্নান শেষে বেরিয়ে দেখি, লিউ ইরান সোফায় চোখ বুঁজে ঝিমুচ্ছে। আমি ওকে না ডেকে সরাসরি নিজের ঘরে গেলাম।

বিছানায় শুয়ে ফোন খুলতেই দেখি, ওয়াং লেক্সিন আবার কয়েকটি মেসেজ দিয়েছে। কৌতূহলবশত দেখে নিলাম—স্বাভাবিক খোঁজখবর ছাড়াও ও জিজ্ঞেস করেছে, ‘‘জিয়াং সাহেবের বিষের কারণ বের করতে পেরেছ?’’

ও না বললে আমার রাগ পেত না; ও জিয়াং লিনফেংকে আমার সব কথা বলে দিয়েছে—আমার দত্তক বাবা ওকে এত বিশ্বাস করেন, অথচ ও এমন করেছে!

আমি পাল্টা লিখলাম, ‘‘তুমি আসলে কী চাইছ?’’

ও দ্রুত উত্তর দিল, ‘‘ভবিষ্যতে সব বুঝবে, আমি যা করছি সব তোমার জন্য!’’

আমি আর কিছু বললাম না—নিজের ভালো বলে যেসব মানুষ কাজকর্ম করেন, তাদের আমি একেবারেই পছন্দ করি না। ওর প্রতি যে সামান্য মায়া ছিল, সেটাও মিলিয়ে গেল।

এ নিয়ে কী উত্তর দেব ভাবছি, হঠাৎ ফোনে নতুন নোটিফিকেশন—‘ফাংগংজি’ নামে এক ব্যক্তি আমাকে বন্ধু হিসেবে যোগ করতে চেয়েছে। ছবি দেখে বুঝলাম, ও তো জিয়াং লিনফেং; তাই অনুরোধ গ্রহণ করলাম।

সে সাথে সাথে একটা ঠিকানা পাঠালো, সাথে লিখল, ‘‘জিয়াং মিস, আগামীকাল জিয়াং পরিবারের পুরানো বাড়িতে আসবেন!’’

ভাবতেই পারিনি, এত তাড়াতাড়ি আমন্ত্রণ জানাবে, তাও সরাসরি নিজের বাড়িতে—আমি ঠোঁটে হালকা হাসি এনে মনে মনে বললাম, কালই দেখা হবে, দেখি তোমরা সাদা চিহ্নকে নিয়ে কী নাটক সাজাও!

আমি ওকে ‘ঠিক আছে’ লিখে পাঠালাম। আবার ওয়াং লেক্সিনকে লিখলাম, ‘‘কাল দেখা হলে কথা হবে! আশা করি তুমিও জিয়াং বাড়ির এই কেলেঙ্কারি দেখতে এসো!’’

তারপর ফোন বন্ধ করে আর কিছু ভাবলাম না—সোজা ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে দেখি, লিউ ইরান নাস্তা কিনে এনেছে। আমাকে দেখে হাসিমুখে বলল, ‘‘আলিয়ান, এসো, নাস্তা খাও! এই শহরের খাবার সত্যিই দারুণ!’’

লিউ ইরান হাজার বছর ধরে ইউন পরিবারে ছিল, মানুষে খাবার খাওয়ার সুযোগ পেত না—এই কয়েকদিন হয়ত দারুণ উপভোগ করছে।

আমার মন ভালো নেই, খেতে ইচ্ছে করছিল না, শান্ত স্বরে বললাম, ‘‘তোমার ভালো লাগলে বেশি খাও। আমি একটু পরে ক্লাসে যাব। আজ রাতে জিয়াং লিনফেং আমাকে তাদের বাড়িতে ডেকেছে, তখন তুমি আমার সঙ্গে যাবে!’’

লিউ ইরান একটু চমকে গেল, তারপর বলল, ‘‘এত তাড়াতাড়ি ডেকে নিয়েছে মানে ওদের সমস্যা বেশ গুরুতর!’’

‘‘ওদের কী সমস্যা?’’ আমার কৌতূহল বেড়ে গেল—এ ধরনের অদ্ভুত ঘটনায় আমার মনে অজানা এক উত্তেজনা জাগে, যেন এসব সমাধান করাই আমার নিয়তি।

‘‘রাতেই জানতে পারবে, এখন নিশ্চিন্তে ক্লাসে যাও,’’ লিউ ইরানও রহস্য রেখে দিল।

আমি আর জিজ্ঞেস করলাম না, যেহেতু ফলাফল জানবই, তাই দু’চামচ খেয়ে ক্লাসে চলে গেলাম।

ক্যাম্পাসে এখনও কেউ কেউ আমাকে আড়চোখে দেখছে, কেউ আবার সামনে পড়লে তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছে—যেন আমি অশুভ কিছু সঙ্গে এনেছি।

ছোটবেলা থেকেই এসব দেখে অভ্যস্ত—এতে আর কিছু মনে হয় না।

আমি মাথা উঁচু করে ক্লাসরুমের দিকে এগোলাম।

শেষ বেঞ্চে গিয়ে চুপচাপ বসে শিক্ষক আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম।

একটা হালকা কাশি শুনে গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখি—আজকের শিক্ষক, সেই গতকালের দেখা ডুগু ছিং।

তিনি ভিতরে এসে আমাদের একবার দেখে নিলেন, শেষ পর্যন্ত আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, ‘‘সবাই, ক্লাস শুরু করি!’’

আসলে কী পড়ালেন, মনেই নেই—মন তো অন্যখানে, শুধু ভাবছিলাম, রাতে কী কী ঘটবে, ভাবনার ডানায় উড়ছিলাম।

পাশের এক বন্ধুর ফিসফিসানি কানে এলো—‘‘আজ ডুগু ছিং স্যার নিজে ক্লাস নিচ্ছেন কেন? উনি তো শুধু বিষ নিয়ে গবেষণা করতেন!’’

‘‘শোনোনি? আমাদের স্কুলে এবার আর বিষের গবেষণার ক্লাস হবে না, ডুগু ছিং স্যারও চলে যাবেন। এখন আর কেউ আমাদের বিষ পরীক্ষার জন্য ডাকবে না!’’

‘‘দারুণ তো! তবে এত বছর ধরে চলা এই পরীক্ষা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল?’’

‘‘শুনেছি, কেউ নাকি পুরো ব্যাপারটার সমাধান করেছে—কে জানে এত বড় সাহসী কে...’’